জাতীয় পোল্ট্রি উন্নয়ন নীতিমালা–২০২৬-এর চূড়ান্ত খসড়ায় বাণিজ্যিক খামারে এক দিন বয়সী মুরগির বাচ্চা আমদানি নিষিদ্ধ করার প্রস্তাব ঘিরে পোল্ট্রি শিল্পে ব্যাপক উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। সক্ষমতা যাচাই ও পর্যাপ্ত প্রস্তুতি ছাড়া এমন সিদ্ধান্ত বাস্তবায়িত হলে ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক খামারিরা সবচেয়ে বেশি ক্ষতির মুখে পড়বেন বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন পোল্ট্রি শিল্পের অংশীজন ও বিশেষজ্ঞরা।
তারা বলছেন, এই সিদ্ধান্ত কার্যকর হলে ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক খামারিরা তীব্র চাপে পড়বেন। একইসঙ্গে বাজারে গুটিকয়েক বড় করপোরেট প্রতিষ্ঠানের একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণ ও সিন্ডিকেট তৈরির ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যাবে।
পোল্ট্রি শিল্পসংশ্লিষ্টদের মতে, পর্যাপ্ত প্রস্তুতি ছাড়া নীতিমালাটি হুবহু বাস্তবায়িত হলে দেশে প্রায় ৬০–৭০ হাজার কোটি টাকার এই শিল্পে বড় ধরনের বিপর্যয় নেমে আসতে পারে। এতে একদিকে প্রান্তিক খামারিরা ক্ষতিগ্রস্ত হবেন, অন্যদিকে সাধারণ মানুষের প্রোটিনের প্রধান উৎস ডিম ও মুরগির মাংসের দাম বেড়ে খাদ্যনিরাপত্তা বিঘ্নিত হওয়ার শঙ্কা তৈরি হবে।
সরকারের ভাষ্য অনুযায়ী, দেশীয় পোল্ট্রি শিল্পকে স্বনির্ভর করতে ধীরে ধীরে আমদানিনির্ভরতা কমানোই নীতিমালাটির মূল লক্ষ্য। তবে খামারিদের দাবি, বাস্তবতায় সেই সক্ষমতা এখনও তৈরি হয়নি। পর্যাপ্ত প্রস্তুতি ছাড়া আমদানি বন্ধ করা হলে বাজারে তীব্র বাচ্চা সংকট তৈরি হতে পারে।
বর্তমানে দেশে এক দিন বয়সী বাচ্চা উৎপাদন মূলত হাতে গোনা কয়েকটি বড় প্রতিষ্ঠানের ওপর নির্ভরশীল। জিপি ও পিএস ফার্মের সংখ্যাও সীমিত। এসব প্রতিষ্ঠানে রোগ সংক্রমণ বা উৎপাদন ব্যাহত হলে বিকল্প উৎস না থাকায় পুরো সরবরাহব্যবস্থা হঠাৎ অচল হয়ে পড়ার ঝুঁকি রয়েছে।
জাতীয় পোল্ট্রি উন্নয়ন নীতিমালা–২০২৬-এর চূড়ান্ত খসড়ায় বাণিজ্যিক পোল্ট্রি মুরগি পালনের জন্য এক দিন বয়সী মুরগির বাচ্চা আমদানি নিষিদ্ধের প্রস্তাব রাখা হয়। গত ১৩ জানুয়ারি মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটে খসড়া নীতিমালাটি প্রকাশ করা হয়। খসড়া অনুযায়ী, এক দিন বয়সী কমার্শিয়াল মুরগির বাচ্চা আমদানির অনুমতি থাকবে না। তবে গ্র্যান্ড প্যারেন্ট (জিপি) স্টক আমদানির সুযোগ রাখা হয়েছে এবং সংকট দেখা দিলে ‘প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রে’ প্যারেন্ট স্টক (পিএস) আমদানির অনুমোদন দেওয়া যেতে পারে।
নীতিমালায় ব্যবহৃত ‘প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রে’ শব্দবন্ধটি নিয়ে শিল্পসংশ্লিষ্টদের মধ্যে বড় উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। তাদের প্রশ্ন—কোন পরিস্থিতিকে ‘প্রয়োজনীয়’ ধরা হবে, সেই সিদ্ধান্ত কে নেবে এবং কত দিনের মধ্যে অনুমোদন মিলবে—এসব বিষয়ে সুস্পষ্ট নির্দেশনা না থাকলে সংকটকালে প্রশাসনিক লালফিতার জটিলতায় সময় নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা থাকবে।
মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, দেশে পোল্ট্রি খাত দ্রুত সম্প্রসারিত হচ্ছে। ২০১৫–১৬ অর্থবছরে মুরগির সংখ্যা ছিল ২,৬৮৩.৯৩ লাখ, যা ২০২৪–২৫ অর্থবছরে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩,৩৬০.৭০ লাখে। একই সময়ে হাঁসসহ মোট পোল্ট্রির সংখ্যা বেড়ে হয়েছে ৪,০৬৬.৫২ লাখ। এই বিশাল উৎপাদন ব্যবস্থার বড় অংশই নির্ভর করছে ধারাবাহিক ও সময়মতো এক দিন বয়সী বাচ্চা সরবরাহের ওপর।
বাংলাদেশ পোলট্রি ইন্ডাস্ট্রিজ অ্যাসোসিয়েশনের (বিপিআইএ) সভাপতি মোশারফ হোসাইন চৌধুরী ইউএনবিকে বলেন, ‘দেশে বর্তমানে এক দিন বয়সী বাচ্চা উৎপাদন হাতেগোনা কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের ওপর নির্ভরশীল। আমদানির পথ বন্ধ হলে বড় কোম্পানিগুলোর একচেটিয়া ব্যবসা বা সিন্ডিকেট করার সুযোগ বাড়বে। কোনো কারণে দেশীয় উৎপাদনে মহামারি বা রোগ দেখা দিলে বাজারে তীব্র সংকট তৈরি হবে, যা সামাল দেওয়া কঠিন হয়ে পড়বে।’
তিনি বলেন, ‘আমাদের মোট চাহিদার ১০–১৫ শতাংশ বাচ্চা আমদানি করতে হয় এবং তা কেবল তখনই করা হয়, যখন দেশীয় বাজারে বাচ্চা পাওয়া যায় না। সংকট কখন তৈরি হবে তা আগে থেকে জানা যায় না। হঠাৎ সংকটে দীর্ঘ প্রশাসনিক প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে আমদানি অনুমোদন পাওয়া বাস্তবসম্মত নয়।’
তিনি আরও বলেন, ‘বার্ড ফ্লু কিংবা প্রাকৃতিক দুর্যোগে কোনো একটি কোম্পানি ক্ষতিগ্রস্ত হলে পুরো বাজার অস্থিতিশীল হয়ে পড়তে পারে। এমন পরিস্থিতিতে অন্তত এক বছর দেশের ডিম ও মুরগির বাজার চাপে থাকবে। তাই পরিকল্পনামাফিক এবং ধাপে ধাপে আমদানিনির্ভরতা কমাতে হবে। অন্যথায় প্রান্তিক খামারিরাই সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবেন।’
বাংলাদেশ প্রাণিসম্পদ গবেষণা ইনস্টিটিউটের সাবেক মহাপরিচালক ও কৃষি অর্থনীতিবিদ ড. জাহাঙ্গীর আলম বলেন, বাচ্চা আমদানি সবার জন্য উন্মুক্ত না রেখে উৎপাদনকারী ও বাজারজাতকারীদের জন্য সীমিত পরিসরে সুযোগ রাখা প্রয়োজন। তার মতে, এতে একদিকে স্বনির্ভরতা বাড়বে, অন্যদিকে জরুরি পরিস্থিতিতে ঘাটতি মোকাবিলার সুযোগ থাকবে।
প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের পরিচালক (উৎপাদন) এ বি এম খালেদুজ্জামান জানান, প্রায় দুই বছর ধরে এই নীতিমালা নিয়ে কাজ করা হয়েছে। ২০২১ সালে কমিটি গঠনের মাধ্যমে প্রক্রিয়া শুরু হয় এবং বিভিন্ন পর্যায়ে বিশেষজ্ঞ ও সংশ্লিষ্টদের মতামত নিয়ে খসড়াটি প্রস্তুত করা হয়েছে। তিনি বলেন, নীতিমালাটি সংশোধন ও হালনাগাদ করার সুযোগ রাখা হয়েছে।
শেরে বাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিসম্পদ উৎপাদন ও ব্যবস্থাপনা বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. সাইফুল ইসলাম বলেন, এই নীতিমালা বাস্তবায়িত হলে ত্রিমুখী সংকট তৈরি হতে পারে, যার প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়বে প্রান্তিক খামারি ও সাধারণ ভোক্তাদের ওপর। বড় সিদ্ধান্তের আগে অংশীজনদের নিয়ে গণশুনানি হওয়া জরুরি ছিল বলেও তিনি মন্তব্য করেন।
বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভেটেরিনারি অনুষদের ডিন অধ্যাপক ড. মো. বাহানুর রহমান বলেন, আমদানি বন্ধের আগে নিশ্চিত করতে হবে—দেশীয় উৎপাদনে নিয়মিত চাহিদা পূরণ করা সম্ভব কি না এবং খামারিরা ন্যায্য দামে বাচ্চা পাচ্ছেন কি না।
মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের সচিব আবু তাহের মুহাম্মদ জাবের ইউএনবিকে বলেন, ‘নীতিমালার মূল লক্ষ্য হলো পোল্ট্রি খাতকে দীর্ঘমেয়াদে টেকসই ও স্বনির্ভর করা। বাংলাদেশ পোলট্রি ইন্ডাস্ট্রিজ অ্যাসোসিয়েশনের দাবি আমরা পেয়েছি। আন্তঃমন্ত্রণালয় সভায় এ বিষয়গুলো আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।’
এ বিষয়ে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা ফরিদা আক্তার ইউএনবিকে বলেন, ‘দেশ ও প্রান্তিক ব্যবসায়ীদের ক্ষতি হয়—এমন কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে না। নীতিমালাটি ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা হয়েছে সবার মতামত নেওয়ার জন্য। সব মতামত বিবেচনায় নিয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।’